শিরোনাম:
দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবিধানিক আদালতের ঐতিহাসিক রায়: আশ্রয় আবেদন শুধু প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে বাতিল করা যাবে না, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভিত্তিহীন বক্তব্যেরও কঠোর সমালোচনা
সংবাদ:
দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবিধানিক আদালত (Constitutional Court of South Africa) আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীদের অধিকার নিয়ে একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। Scalabrini Centre of Cape Town and Another v Minister of Home Affairs and Others (Case CCT 126/25) মামলায় ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে সর্বসম্মতভাবে এই রায় ঘোষণা করা হয়।
এই মামলার আবেদনকারী ছিল Scalabrini Centre of Cape Town এবং তাদের ট্রাস্টি বোর্ড। অন্যদিকে বিবাদী হিসেবে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (Minister of Home Affairs), স্বরাষ্ট্র বিভাগের মহাপরিচালক (Director-General), আশ্রয়প্রার্থী ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান (Chief Director of Asylum Seeker Management), Refugee Appeals Authority of South Africa এবং Standing Committee for Refugee Affairs।
মামলায় আদালতের বন্ধু (Amicus Curiae) হিসেবে অংশ নেয় Helen Suzman Foundation, Amnesty International, Global Strategic Litigation Council for Refugee Rights, International Detention Coalition এবং United Nations High Commissioner for Refugees (UNHCR)। এসব সংস্থা আদালতে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অধিকার সম্পর্কে লিখিত মতামত প্রদান করে।
কেন এই মামলা করা হয়েছিল?
এই মামলায় মূল প্রশ্ন ছিল, Refugees Act 130 of 1998-এর কিছু ধারা এবং Refugee Regulations-এর কিছু বিধান সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
পশ্চিম কেপ হাইকোর্ট ১৫ মে ২০২৫ সালে রায় দিয়েছিল যে, আইনের ধারা 4(1)(f), 4(1)(h), 4(1)(i) এবং 21(1B) সংবিধানের পরিপন্থী এবং অবৈধ। পরবর্তীতে সেই রায় নিশ্চিত করার জন্য বিষয়টি সাংবিধানিক আদালতে আসে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
সাংবিধানিক আদালত জানায়, কোনো ব্যক্তি যদি আশ্রয়ের আবেদন করতে চান, তাহলে শুধুমাত্র প্রশাসনিক বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে তাঁর আবেদন বাতিল করা যাবে না।
আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, প্রতিটি আশ্রয় আবেদন তার প্রকৃত যোগ্যতা (merits) অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হবে। আবেদনকারী কাগজপত্র দাখিলে দেরি করেছেন বা কোনো প্রক্রিয়াগত ভুল করেছেন, এমন কারণে তাঁকে আশ্রয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা সংবিধানসম্মত নয়।
রায়ে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ "Non-Refoulement" নীতির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এই নীতির অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে তাঁর জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
রাষ্ট্রপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য
রায়ের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদে আদালত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনজীবীদের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে।
আদালত উল্লেখ করে, শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছিলেন যে আফগান ও বাংলাদেশি নাগরিকরা দক্ষিণ আফ্রিকায় মানবপাচার ও অপহরণ চক্রের সঙ্গে জড়িত।
কিন্তু আদালত দেখতে পায়, এই গুরুতর অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
বিচারপতি বলেন, এ ধরনের ভিত্তিহীন ও সাধারণীকৃত অভিযোগ শুধু রাষ্ট্রের মামলার বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষুণ্ন করে না, বরং বিদেশিবিদ্বেষ (Xenophobia) এবং জাতিগত বিদ্বেষকে উৎসাহিত করতে পারে। আদালতের মতে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সরকারের বৈধ স্বার্থ থাকলেও, তা কখনোই প্রমাণহীন ও পক্ষপাতমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে না।
আদালতের চূড়ান্ত আদেশ
সাংবিধানিক আদালত সর্বসম্মতভাবে পশ্চিম কেপ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে এবং ঘোষণা করে যে:
Refugees Act-এর ধারা 4(1)(f), 4(1)(h), 4(1)(i) এবং 21(1B) সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাই অবৈধ।
আবেদনকারীদের আইনি ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে, যার মধ্যে দুইজন আইনজীবীর খরচও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এই রায়ের গুরুত্ব কী?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় দক্ষিণ আফ্রিকায় আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীদের অধিকার সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখন থেকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক বা কারিগরি ত্রুটির কারণে কোনো আশ্রয় আবেদন বাতিল করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে আদালত রাষ্ট্রের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, অভিবাসন ও আশ্রয় সংক্রান্ত মামলায় প্রমাণ ছাড়া কোনো জাতীয়তা বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা গ্রহণযোগ্য নয়।
এই রায় ভবিষ্যতে দক্ষিণ আফ্রিকার আশ্রয় ও শরণার্থী ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং সংবিধানসম্মত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।
